ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন যখন ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, তখন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে তরুণ প্রজন্ম—বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের ভাবনা, প্রত্যাশা ও শঙ্কা। ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুনর্চর্চা, সুশাসন ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে তারা আর নীরব থাকতে চায় না। গ্রহণযোগ্য, স্বচ্ছ ও জনগণের আস্থাভাজন একটি নির্বাচনই এখন তাদের প্রধান দাবি।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই শিক্ষার্থীদের আলোচনায় উঠে আসছে একই সুর। কেউ বলছেন, এটি তাদের জীবনের প্রথম ভোট; কেউ আবার আগের অভিজ্ঞতা থেকে সতর্ক হলেও পরিবর্তনের আশায় বুক বাঁধছেন। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মতামত বলছে, এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়, বরং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বিল্লাল হোসেন লাদেন মনে করেন, বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামো গণতান্ত্রিক হলেও বাস্তবে স্বাধীনতার পর থেকেই প্রকৃত গণতন্ত্র বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সামরিক শাসন, একদলীয় কর্তৃত্ব এবং বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তার অভিমত। বিশেষ করে গত দেড় দশকে প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণ, মতপ্রকাশ দমন এবং অর্থনৈতিক সংকটে গণতন্ত্র প্রায় বিপর্যস্ত অবস্থায় পৌঁছেছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে রাষ্ট্র সংস্কার ও সুষ্ঠু নির্বাচনের যে ঐতিহাসিক দায়িত্ব এসেছে, তা সফলভাবে পালন করাই এখন সময়ের দাবি।
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মিনহাজুল ইসলাম জিসানের কাছে আসন্ন নির্বাচন জীবনের প্রথম ভোট। তার ভাষায়, একটি ভোট একটি আমানত। যোগ্য প্রার্থী বাছাই করা কেবল অধিকার নয়, নৈতিক দায়িত্বও। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচনের মাধ্যমেই দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব—এই বিশ্বাসই তাকে ভোটকেন্দ্রে যেতে অনুপ্রাণিত করছে।
হলি ফ্যামিলি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী মাবরুর ইসলাম সিয়াম নির্বাচনকে দেখছেন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে। তার প্রত্যাশা, পুরো প্রক্রিয়াটি হবে স্বচ্ছ ও সহিংসতামুক্ত। প্রযুক্তির ব্যবহার, সুষ্ঠু পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত ফল প্রকাশ নির্বাচনকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করতে পারে বলে তিনি মনে করেন। দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী ও দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনব্যবস্থায় মানুষের যে তিক্ততা তৈরি হয়েছে, একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন তা কাটিয়ে ওঠার পথ দেখাতে পারে—এমন আশাও তার।
প্রাইম মেডিকেল কলেজ, রংপুরের শিক্ষার্থী তামিম আল-হাসান বলেন, জাতীয় নির্বাচন গণতন্ত্রের ভিত্তি। তার প্রত্যাশা, দেশের চালকের আসনে আসবেন একজন সৎ, যোগ্য ও বাংলাদেশপন্থী মানুষ। জুলাই ’২৪-এর আন্দোলনের স্মৃতি তাকে শিখিয়েছে—দেশের স্বার্থই সবার আগে। যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তারা যেন স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জনসেবার উন্নয়নে কাজ করে এবং জাতীয় ঐক্য বজায় রাখে—এটাই তার চাওয়া।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাওহীদুল ইসলাম সিয়ামের কণ্ঠে শোনা যায় প্রত্যাশার পাশাপাশি উদ্বেগও। জীবনের প্রথম ভোট দিতে যাচ্ছেন তিনি। সাম্যের বাংলাদেশ, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, দলীয় প্রভাবমুক্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান—এসব তার স্বপ্ন। তবে নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা, প্রাণহানি, ভোট কেনাবেচা ও প্রশাসনের নীরব ভূমিকা তাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে—এই নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে?
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তৌফিক রানা ইরাম দ্বিতীয়বার ভোট দেওয়ার অপেক্ষায়। আগের অভিজ্ঞতা তাকে সতর্ক করেছে, তবে পরিবর্তনের সম্ভাবনাও তিনি দেখছেন। গণভোটকে তিনি দেখছেন সংস্কারমূলক উদ্যোগ হিসেবে, যেখানে জনগণ সরাসরি মত প্রকাশের সুযোগ পাবে। প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের কার্যকারিতাই এবার মূল পরীক্ষার বিষয় বলে মনে করেন তিনি।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এস. এম. ইবাদুর রহমান ইতিহাসের দীর্ঘ শাসন ও শোষণের প্রেক্ষাপটে আসন্ন গণভোটকে দেখছেন এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে। তার মতে, এটি কোনো দলের নয়, দেশের প্রশ্ন। জনগণের সরাসরি রায়ই পারে ফ্যাসিবাদী রাজনীতি থেকে মুক্তির পথ দেখাতে।
রুয়েটের শিক্ষার্থী ইমরানুল ইসলাম সিয়ামের কাছে প্রথম ভোট গর্ব ও দায়িত্বের প্রতীক। তরুণ ভোটারের অংশগ্রহণ বাড়ায় গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন তিনি। তবে অতীতের সহিংসতা ও অনিয়মের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের কঠোর ভূমিকা, নিরপেক্ষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারের ওপর জোর দেন তিনি।
সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে উঠে আসছে একটাই বার্তা—এই নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথচলার দিকনির্দেশনা। আশার পাশাপাশি শঙ্কা থাকলেও তরুণ প্রজন্ম স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে, তারা একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও গণতান্ত্রিক নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার। তাদের এই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারলেই হয়তো দেশের গণতন্ত্র নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবে।