দেশপ্রেমিক খোকনের চোখে জিয়া পরিবার ও বিএনপি

A
Admin
২৫ জুলাই, ২০২৬ ১৬:৩৭:২৮
শহীদ জিয়াউর রহমানের জীবন ছিল দায়িত্ব, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগে পরিপূর্ণ একজন সৈনিক থেকে রাষ্ট্রনায়কে উত্তরণের বিরল উদাহরণ। বাংলার মাটি আর সবুজ প্রান্তরের বুক চিরে জন্ম নেওয়া এক রাখাল রাজা যিনি ইতিহাসে চিরস্বরণীয় হয়ে আছেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নামে। ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারী বগুড়ার এক সাধারন মুসলিম পরিবারে তার জন্ম। তার পিতার নাম ছিল মনসুর রহমান। মাতার নাম ছিল জাহানারা খাতুন। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে জিয়াউর ছিলেন তৃতীয়। তার বাবা কলকাতা শহরে এক সকারী দপ্তরে রষায়নবিদ হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

জিয়াউর রহমানের শৈশব ছিল অতি সাদামাটা, গ্রামের ধুলোমাখা পথে দৌড়ে বেড়ানো রাখালের বাঁশির সুরে বড় হয়ে ওঠা এক শিশুর জীবন। শৈশবের কিছুকাল গ্রামে এবং কিছুকাল শহরে অতিবাহিত হয়। ভারত পাকিস্তান ভাগ হওয়ার ফলে তার বাবা পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি শহরে বদলি হয়ে গেলে কলকাতার হেয়ার স্কুুল ত্যাগ করেন এবং করাচি একাডেমি স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু সময়ের অদৃশ্য হাত তাকে নিয়ে যাচ্ছিল এক অসাধারণ নিয়তির দিকে।

১৯৫২ সালে করাচি একাডেমি স্কুল থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। তারপর ১৯৫৩ সালে করাচিতে জিজে কলেজে বর্তি হন। এক বছরে তিনি কাকুন মিলিটারি একাডেমিতে অফিসার ক্যারেট হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৫৫ সালে সামরিক বাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। করাচিতে দুই বছর চাকরি করার পর ১৯৫৭ সালে তিনি ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে বদলী হয়ে পূর্ব পাকিস্তান আসেন। এছাড়াও তিনি ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করেন। এই সময় ১৯৬০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের দিন্জাপুরের বালিকা খালেদা খানম এর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের কয়েক বছর পর ১৯৬৫ সালের পর খালেদা জিয়া করাচিতে স্বমীর কাছে চলে যান। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে পাঞ্জাবের ক্রিমক্রাম সেক্টরের একটি কোম্পানীর নেতৃত্ব দিয়ে সাহসীকতা ও পাকিস্তান প্রেমের পুরস্কার হিসেবে জিয়ার কোম্পানী সর্বাধিক বিরত্বের মেডেল পায়। নিজে হিলাল-ই-জুরাত খেতাব পান যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধেও উপাধি বীর উত্তম এর সমতুল্য। এরপর জিয়া ১৯৬৬ সালে পাকিস্তানী মিলিটারি একাডেমিতে ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে যোগদান করেন। একি সালে কোয়েটার ঈড়সধহফ ধহফ ংঃধভভ পড়ষষধমব এ উচ্চতর কমিশন নেন। ১৯৬৯ সালে জার্মানিতে উচ্চতর গোয়েন্দ প্রশিক্ষণ এ ব্রিটিশ সেনাবাহীনিদের সাথে কাজ করেন। একিবছর পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটায় স্টাফ কলেজে কমানান্ড কোর্সে যোগ দেন। ১৯৭০ মেজর পদে পদন্নতি পেয়ে পূর্বপাকিস্তান জয়দেবপুর সেকেন্ড ইষ্টবেঙ্গলে সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহন করেন।

জিয়াউর রহমান ছিলেন সাহস আর শৃঙ্খলা প্রতীক। পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে শিক্ষা গ্রহণ করে তিনি হয়ে ওঠেন একজন দক্ষ ও দৃঢ়চেতা সেনা কর্মকর্তা। কিন্তু তার প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রক্তঝরা দিনগুলোতে। সেই উত্তাল সময়ে চট্টগ্রামের কালূরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তার বজ্র কন্ঠে উচ্চারিত হয় স্বাধীনতার ঘোষণা। সে ঘোষনা শুধু একটি বার্তা নয় তা ছিল বাঙ্গালীর বুকের ভেতর জমে থাকা ভয় ভেঙ্গে দেওয়ার এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। একজন মেজর যিনি হয়ে উঠেছিলেন লাখো মুক্তিযোদ্ধার প্রেরণা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর আগে ১৯৭০ সালে তিনি চট্টগ্রাম সেনাবাহিনী ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সহ-অধিনায়ক হিসেবে সেখানে বদলি হন। আর ঐ রেজিমেন্টের সহকারী কর্নেল আলী আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন তখনই জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ করার পরিকল্পনা করেন। তিনি বলেন প্রায় সময় দেখতাম তিনি দেশের ব্যাপারে খুব চিন্তিত থাকতেন। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চের রাত্রে নিরস্ত্র মানুষের উপর পাকিস্তান বাহিনীর আক্রমন এর পর অষ্টম ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যরা বিদ্রোহো করেন জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে। ১৯৭১ সালে ২৫ শে মার্চ রাতে যখন আমরা শুনলাম পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্মম ও বর্বর নৃশংস হত্যাকান্ডের মাধ্যমে সমগ্র ঢাকাকে তাদের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে এসেছে। চট্টগ্রাম থেকে একমাত্র তখন আমরা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এর নেতৃত্বে বিদ্রোহ করি। ২৫ শে মার্চের শেষ প্রহরে অথবা ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষনা দেন যা ট্রান্সমিটার এর মাধ্যমে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পাড়ে। মেজর জিয়া ও তার বাহিনী সামনের সারি থেকে মুক্তিযুদ্ধে পরিচালিত করেন এবং বেশ কয়েক দিন চট্রগ্রাম এবং নোয়াখালী অঞ্চল নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর মুখে কৌশলগতভাবে সীমানা অতিক্রম করেন। ১০ এপ্রিল মুজিব নগর সরকার গঠন ১৭ এপ্রির মুজিব নগর সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের পর তিনি এক নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত হন। চট্্রগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ,রাঙ্গামাটি, মিরসরাই, রামগঞ্জ, ফেনীসহ বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেন।

তিনি ফেনী ছাত্র-যুবকদেরকে সংগঠিত করে প্রথম প্রথম তারা ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তিনটি সমন্বয়ে মুক্তি বাহিনীর প্রথম খন্ড বিগ্রেড জেড ফোর্স এর অধীনায়ক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমান পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের এপ্রিল হতে জুন পর্যন্ত এক নম্বর সেক্টর কমান্ডার এবং তারপর জুন হতে অক্টেবর পর্যন্ত যুগপত ১১ নম্বর সেক্টরের ও জেড ফোর্সের কমান্ডার হিসেবে তিনি যুদ্ধে অংশ গ্রমন করেন। দীর্ঘ্য নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর দেশ পরাধীনতার শৃঙ্খল হতে মুক্ত হলে লাল সবুজের পতাকায় স্বাধীন দেশে পুনরায় সেনাবাহিনীতে ফিরে যান এবং ১৯৭২ সালের জুন মাসে সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিপ অব মেজিস্ট্রেট স্টাফ হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি তিনি বিগ্রেডিয়ার পদে এবং বছরের শেষে মেজর জেনারের পদে পদন্নতি লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধে বিরত্বের জন্য বাংলাদেশ তাকে বীর উত্তম খেতাবে ভুষিত করেন।

শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর খন্দকার মোস্তাক রাষ্ট্রপতি হলেও সবকিছুর কলকাঠি হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত সেনাকর্তারা। তখন সেনাবাহিনীর চিপ অব কমান্ড ভেঙ্গে পড়েছিল। এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে আসে ৩ নভেম্বর অভ্যুথান। এই অভ্যুথানের মাধ্যমে খন্দকার মোসতাক আহমেদকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং বন্ধি করা হয় সেনা প্রধান জিয়াউর রহমানকে। খালেদ মোশারফের এই অভ্যুথান স্থায়ী হয়েছিল মাত্র চারদিন। ১০ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে পাল্টা আরেকটি অভ্যুথানে নিহত হয় খালেদ মোশরফ সহ আরো কয়েকজন উদ্ধর্তন সেনা কর্মকর্তারা। সেই অভ্যুথানের মাধ্যমে সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেন সেনাবাহিনীরা। এরপর ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন মেজর জিয়াউর রহমান। জিয়ার ক্ষমতা গ্রহন ১৩ নভেম্বর ১৯৭৫।

অভ্যুথানের মাধ্যমে খন্দকার মোস্তাককে ক্ষতাচ্যুত করা খালেদ মোশারফ এর নেতৃত্বে অফিসাররা ৫ই নভেম্বর ক্ষমাতাচ্যুত হন। ৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করেন আবু সাদাত মুহম্মদ সায়েম। ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে পাল্টা অভ্যুথানের পর বন্ধিদশা থেকে মুক্ত হয়ে ক্ষমতায় চলে আসে মেজর জিয়াউর রহমান। আবু সাদাত মুহম্মদ সায়েম একাধারে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। কিন্তু ১ বছর পরে ১৯ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতি সায়েমকে সরিয়ে জিয়াউর রহমান নিজেকে রাষ্ট্রপতি অধিষ্টিত করেন। রাষ্ট্রপতি হওয়ার ১ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ জাতিয়তাবাদী দল বিএনপি গঠন করেন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমানের জন্য আশির্বাদ হয়ে আসে। এই অভ্যুথান বাংলাদেশের রাজনিতীর খোলস বদলে দেয়।
মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ যখন ধ্বংসস্তুপে দাঁড়িয়ে তখন জিয়াউর রহমান নিজেকে শুধুই একজন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি বুঝেছিলেন স্বাধীনতা মানে শুধু পতাকা নয়, স্বাধীনতা মানে মানুুষের মুখে হাসি ফিরিয়ে আনা। রাজনীতিতে প্রবেশ করে তিনি দায়িত্ব নেন এক বিপর্যস্ত রাষ্ট্র গঠনের। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার কন্ঠে উচ্চারিত “বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ” ছিল জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার এক নতুন দর্শন।

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দল নতুন এক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার দল আওয়ামীলিগের প্রতি। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের মধ্যে ডানপন্থি রাজনিতীর উদ্ভব হয়। ক্ষমতায় থাকাকালীন জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পরে বাংলাদেশের জাতীয়তাদল বা বিএনপি অন্যতম বড় রাজনৈতিক দলে পরিনত হয়। জিয়াউর রহমানের শাষনকালে রাজনীতি, কুটনীতিতে বড় পালা বদল ঘটে।

এই সব ঘটনা অনেকের দৃষ্টিতে ইতিবাচক আবার অনেকের দৃষ্টিতে নিতীবাচক। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পরে বাংলাদেশে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় শাসন ব্যবস্থায় রাজনীতিতে ফেরে। পুনপ্রাবর্তনের ফলে তৎকালীন বাংলাদেশে একাটি মোলিক পরিবর্তন আসে। এর ফলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির দলভুক্ত হয় বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পরে ১৯৭২ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু জিয়াউর রহমান বহুদলীয় রাজনীতে ফিরে আাসর ফলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি চালুর সুযোগ হয়। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পরে জাতীয়বাদ ধারা চালু করে এবং সংবিধানে সেটা অন্তর্ভুক্ত করেন। জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ এর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন অধ্যাপক এমাজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন বাংলাদেমে অনেক ধর্ম, বর্ণ, গোষিঠর লোক বাস করেন তাদের সংগ্রাম এবং জীবন যাত্রার মান আলাদা ও ভিন্ন । জিয়াউর রহমান মনে করেন শুধুমাত্র ভাষা ও সাংস্কৃতির ভিত্তিতে নয় বরং ভুখন্ডের ভিত্তিতেই জাতীয়তাবাদকে গ্রহন করা উচিৎ।

জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি পর্যবেক্ষণ করে অনেকে মনে করেন জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ভারত থেকে বেরিয়ে চীন, আমেরিকা, সৌদি আরব এর সাথে সুসম্পর্ক তৈরী হয়। জিয়াউর রহমান ভারত বিরোধী ভুমিকায় যাননি। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সাথে অন্যান্য দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। মুসলিম দেশগুলোর ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে সম্পর্ক জোরদার করার জন্য বাংলাদেশের সংবিধানে একটি অনুচ্ছেদ যোগ করেন। জিয়উর রহমানের শাসনামলে দক্ষিণ এশিয়ার জোট এক করার জন্য তিনি সংগ্রামী ভুমিকা পালন করেন। এছাড়া জিয়াউর রহমানের শাসনামলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা সংসদ পরিষদে অস্থায়ী সরকার হিসেবে নির্বাচিত হয়। পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করে জিয়াউর রহমান সবাইবে অর্ন্তভুক্ত করে রাজনিতী ও সরকার পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন।

গ্রাম বাংলার মানুষের প্রতি ছিল তার গভীর মমতা। কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর সবাইকে তিনি ভাবতেন একটি শক্তিশালী বাংলাদেশের কথা। বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ উন্মুক্ত করে তিনি রাজনীতিতে ভিন্নমতের স্বীকৃতি দেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, গ্রামীণ উন্নয়ন সবখানেই ছিল তার সক্রীয় ছাপ।

১৯ দফা কর্মসূচি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ছিল। এই কর্মসূচির মধ্যে ছিল রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক বিভিন্ন দিক অন্তর্ভুক্ত ছিলো। কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল কৃষি উৎপাদন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ, ব্যক্তিখাতে শিল্প কারখানার বিকাশ। এই কর্মসূচির একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল খাল খনন কর্মসূচি এবং গ্রাম সরকার ব্যবস্থা চালু করা। তিনি পুলিশ বাহিনী শক্তিশালী করেন। পুলিশের সংখ্যা দ্বিগুণ বৃদ্ধি করেন। তিনি তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে ৮ মার্চ মহিলা পুলিশ গঠন করেন। তিনি ১৯৭৬ সালে গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন করেন।

জিয়াউর রহমান অসম্ভব জনপ্রিয় ছিলেন। কিন্তু ইতিহাস বড়ো নিষ্ঠুর। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকাকালীন সেনা ও বিমান বাহিনীতে দফায় দফায় অভ্যুত্থান হয়। প্রতিটি অভ্যুত্থান কঠোর হস্তে দমন করেন জিয়াউর রহমান। অনেক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। বিপদের সমূহ সম্ভাবনা জেনেও চট্টগ্রামের স্থানীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে গিবত-কলহ থামানোর জন্য ১৯৮১ সালে ২৯ মে চট্টগ্রাম এ আসেন এবং সেখানে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে থাকেন। তারপর ৩০ মে গভীর রাতে এক ব্যর্থ সামকির অভিযানে নিহত হন।
 
জিয়াউর রহমানকে ঢাকার শেরেবাংলায় সমাহিত করা হয়। প্রেসিডেন্টের জানাজায় বাংলাদেশের অধিকমাত্রায় জনগণ শরিক হয়। সেখানে প্রায় ২০ লক্ষাধিক মানুষ জানাজায় শরিক হন। তাকে চন্দ্রিমা উদ্যানে দাফন করা হয়।

বন্দুকের গুলিতে থেমে যায় এক সংগ্রামী হৃদয়ের স্পন্দন, কিন্তু থেমে যায় না তার আদর্শ। রক্তে রঞ্জিত সেই ভোর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বয়ে আনে এক গভীর শোক আর শূন্যতা। শহিদ জিয়া আজও বেঁচে আছেন মানুষের স্মৃতিতে, সংগ্রামে, সাহসে। তিনি ছিলেন রাখাল রাজা যিনি সাধারণ মানুষের মাঝ থেকে উঠে এসে একটি জাতিকে পথ দেখিয়েছেন। ইতিহাসের পাতায় তিনি শুধু একজন রাষ্ট্রপতি নন, তিনি এক অনন্ত প্রেরণার নাম।


এক নজরে শহিদ জিয়া
১৯ জানুয়ারি ১৯৩৬ : বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ।
১৯৪০,১৯৫০ : শৈশব ও প্রাথমিক শিক্ষা কলকাতা ও বগুড়া অঞ্চলে।
১৯৫৩ : পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি, কাকুলে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান।
১৯৫৫ : কমিশনপ্রাপ্ত হয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান (২য় লেফটেন্যান্ট)।
সেনাবাহিনীতে কর্মজীবন (পাকিস্তান আমল)
১৯৫৫,১৯৭০ : বিভিন্ন সামরিক ইউনিটে দায়িত্ব পালন।
১৯৬৫ : ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে অংশগ্রহণ।
১৯৬৬,১৯৬৯ : স্টাফ কলেজসহ বিভিন্ন সামরিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন।
১৯৭০ : মেজর পদে উন্নীত।
মহান মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১)
২৫ মার্চ ১৯৭১ : পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরু।
২৬২৭ মার্চ ১৯৭১ : চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ।
এপ্রিল ১৯৭১ : ১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ।
জুন ১৯৭১ : জেড ফোর্স গঠন ও কমান্ডার নিযুক্ত।
ডিসেম্বর ১৯৭১ : মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন; বাংলাদেশ স্বাধীন।
স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব
১৯৭২ : বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ব্রিগেডিয়ার হিসেবে যোগদান।
১৯৭৩ : ডেপুটি চিফ অব স্টাফ।
২৫ আগস্ট ১৯৭৫ : সেনাবাহিনীর প্রধান নিযুক্ত।
৭ নভেম্বর ১৯৭৫ : সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের পর জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন
১৯ এপ্রিল ১৯৭৭ : গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ।
১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ : বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা।
১৯৭৮ : রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ী।
১৯৭৭,১৯৮১ : বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সম্প্রসারণ
গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন ও কৃষি উৎপাদনে জোর
“বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ” দর্শনের প্রবর্তন।
ইসলামি বিশ্বের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার
স্বনির্ভর অর্থনীতি ও শ্রমভিত্তিক উন্নয়ন দর্শন প্রণয়ন
শাহাদাত
৩০ মে ১৯৮১ : চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে ভোররাতে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে শহিদ হন।
৩১ মে ১৯৮১ : ঢাকায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন (শেরেবাংলা নগর)।

 
 
খালেদা জিয়া

বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে যার নাম উচ্চারিত হলেই সংগ্রাম, দৃঢ়তা আর আপোশহীন নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে তিনি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তার জন্ম। পিতা মরহুম ইস্কানদার মজুমদার ছিলেন সফল ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক। শৈশব থেকেই খালেদা জিয়ার জীবনে ছিল শৃঙ্খলা, আত্মমর্যাদা ও নীরব দৃঢ়তার ছাপ, যা পরবর্তীতে তাকে ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়ে পরিণত করে।

১৯৬০ সালে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তৎকালীন তরুণ সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সাথে। এই দাম্পত্য শুধু ভালোবাসার ছিল না, ছিল ত্যাগ আর পারস্পরিক সম্মানের এক অনন্য বন্ধন। তাদের সংসার জীবনে জন্ম নেয় দুই পুত্র তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো। একজন গৃহিণী হিসেবে খালেদা জিয়া ছিলেন নিঃশব্দ, কিন্তু ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন তার জীবনকে আমূল বদলে দেয়।

শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর এক শোকাহত স্ত্রী ধীরে ধীরে পরিণত হন সংগ্রামী নেতৃত্বে। ব্যক্তিগত বেদনা তখন রূপ নেয় জাতীয় দায়িত্বে। ১৯৮০ দশকে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সাহসী কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন। রাজপথ, কারাগার, আন্দোলন কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারেনি।

মেজর জিয়া যখন সহিদ হোন, তখন খালেদা জিয়া একজন গৃহবধূ, দুই ছেলেকে নিয়ে তার সংসার। বড়ো ছেলে তারেক রহমান তখন ১৬ বছর বয়স। আরাফাতের বয়স তখন ১১ বছর। স্বামী মারা যাওয়ার পরে বিএনপি যখন কাণ্ডারি হারা তখনো ইচ্ছা ছিল না রাজনীতিতে আসার, কিন্তু জিয়াউর রহমান শহিদ হওয়ার পরে কে ধরবেন দেশের হাল? বিএনপি তখন দেশের সবচেয়ে বড়ো শক্তিশালী দল। শহিদ জিয়ার মৃত্যুর পর এমন একজন যোগ্য উত্তরসূরি হবে। তখন দেশ ও মানুষের প্রয়োজনে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বেগম জিয়া বিএনপির একজন কর্মী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। একি বছর ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত করে প্রথম রাজনৈতিক বক্তব্য রাখেন।

১৯৮৩ সালে হন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান। সেটা চাননি সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদ। কিন্তু দলের মানুষের স্বপ্ন পুরন করতে এবং জিয়াউর রহমানের অসমাপ্ত বাস্তবায়ন করতে তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন। এ সম্পর্কে খালেদা জিয়া বলেন- সহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বপ্ন পুরন করতে, তার আদর্শকে সমুন্নত রাখতে আমি রাজনীতিতে যোগ দিয়েছি।

তিনি তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, দারিদ্র্য বিমোচন ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তার অবস্থান ছিল দৃঢ় ও স্পষ্ট। রাজনৈতিক জীবনে তিনি বহুবার নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, কারাবরণ করেছেন, কিন্তু মাথা নত করেননি, কারণ তিনি আপোশহীন। বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পরে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে পড়েন বেগম খালেদা জিয়া। দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখে প্রশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন ঘোষণা দেন। আট বছর একটানা সংগ্রামের পর ১৯৯১ সালে ২০ ফেব্রুয়ারি বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন। বেগম জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অসীম ধৈর্য, অসামান্য যোগ্যতায় সামান্য গৃহবধূ থেকে দেশের সর্বোচ্চ পর্যায় নিজে আসন গ্রহণ করেন। তিনি কখনো নির্বাচনে হারেননি। পুরো বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে এক সঙ্গে ৫টি আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে তিনি তার সর্বোচ্চ জনপ্রিয়তার আসন অধিষ্ঠিত করেন। তিনি সাফল্যের সাথে তিন তিনবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি ক্ষমতায় এসে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষা ও স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহ সংরক্ষণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। রায়ের বাজারে শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতি সৌধ নির্মাণ করে পাকিস্তানিদের হাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারানো বুদ্ধিজীবীদের প্রতি জাতির সম্মান প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেন। এরপর ২০০১ সালে সরকার গঠন করে খালেদা জিয়া মুক্তি যোদ্ধাদের কল্যাণে সরাসরি সরকারকে সম্পৃক্ত করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তার নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবিকে খুঁজে বের করে মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ রাষ্ট্রীয় পদক, বীর প্রতীক হস্তান্তর করেন। খালেদা জিয়া পাকিস্তানে অসম্মানিত অবস্থায় পড়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধে বীরশ্রেষ্ঠ বীর সৈনিক মতিউর রহমানের লাশ বাংলাদেশে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন।

তিন দফায় সরকার গঠন করে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যেগুলো রাজনীতির ইতিহাসে মাইল ফলক হয়ে থাকবে।
 
সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠা ও ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন।
 
খালেদা জিয়ার সরকার রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনারয় ৬০টি সংসদীয় কমিটি গঠন করেন। যাতে বিরোধী দলীয় সংসদদেরকে গুরুত্বসহকারে অবস্থান দেওয়া হয়। শিক্ষাখাতে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক আইন এবং মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনা বেতনে পড়াশুনার ব্যবস্থা করা তার সরকারের অন্যতম অবদান।

তার সরকারের আমলেই বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পথচলা শুরু হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন তার সরকারের আমলেই গৃহীত হয়। তিনি জিয়াউর রহমানের অর্থনীতি অনুসরণ বেসরকারীকরণের উপর গুরুত্ব আরোপ বরেন। ব্যক্তিগত আয়কর প্রদানের হার ৫৫ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে নিয়ে আসেন। ব্যাবসা বাণিজ্য সহজ করার লক্ষ্যে ৭ ধরনের শুল্ক হ্রাস করে ৭ ধরনের আমদানি হ্রাস করেন। খালেদা জিয়া বাংলাদেশে মুক্তবাজার অর্থনীতির সূচনা করেন। দেশের ভাগের খনিজ সম্পদকে কাজে লাগাতে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি ও মধ্যপাড়ায় শ্বেত পাথরের খনি থেকে উত্তোলন করা তার সরকারের আমলেই শুরু হয়।

খালেদা জিয়ার আমলে নারীদের আত্মনির্ভরশীল রূপে গড়ে তোলার জন্য প্রধান মন্ত্রীর তহবিল থেকে সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা প্রকল্প চালু করা হয়। আত্মকর্ম সংস্থান কর্মসূচির অংশ হিসাবে সহজ শর্তে ঋণ সেবা সহায়তা চালু করা হয়। তিনি আনসার ভিডিপি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। স্বাস্থ্যখাতে সমস্য ও সংকট নিরসনে তার সরকারের সময়ের কার্যক্রম সুবিদিত। প্রতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৩১ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করেন, এবং জেলা কমপ্লেক্সকে ১০০ থেকে ২৫০ এবং ৫০ থেকে ২০০ শয্যায় উন্নীত করেন। দেশের ৯০ ভাগ মানুষের জন্য তার সরকার সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশের টেলিকমিউনিকেশন খাতেও খালেদা জিয়ার অবদান অনস্বীকার্য। তার সময় সেলুলার ফোন ও আইএসডি ফোনের সূচনা হয়। অন্তত তিন লক্ষ টেলিফোন সংযোগ চালু করা হয়।

বেগম খালেদা জিয়ার সরকার ৩৩০ টি উপজেলাকে বিদ্যুতায়নের আওতায় নিয়ে আসে। উপকূলীয় জেলাগুলোতে হাজারের বেশি সাইক্লোন সেন্টার তৈরি করা হয়। ধর্মীয় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় বেগম খালেদা জিয়ার সরকার গুরুত্ব দেয়। তার সরকারের আমলে এসেছে অসংখ্য মসজিদ, মন্দির, ইদগা এবং অন্যান্য উপসনালয় নির্মাণ করা হয়। ঢাকার আশকোনায় হজ্জ যাত্রীদের সুবিধার্থে একটি স্থায়ী হজ্জ ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করা হয়। এছাড়াও তাবলীগ জামাতের বৃহৎ সম্মেলন বিশ্ব ইজতেমার জন্য টঙ্গিতে অতিরিক্ত ৩০০ একর জমির বন্দোবস্ত করা হয়।

২০০৭ সালে ১১ জানুয়ারি দেশের জরুরি অবস্থার মধ্যে দিয়ে দেশে এক এগারো সরকার ক্ষমতার দখলে চলে আসে। রাজনৈতিক দলগুলোর সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। শুরু হয় ধড়পাকড়। ৩ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। সরকার শুরু করে মাইনাস টু বাস্তবায়নের ষড়যন্ত্র। স্বাধীনতার ঘোষক শহিদ জিয়াউর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধকে দমন করতে দুই শিশু সন্তানসহ যেভাবে আটক করেছিল পাকিস্তান, ঠিক তেমন ভাবে এক এগারো সরকার ২০০৭ সালে আটক করে। তার সাথে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে রাজনীতির মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে আটক করা হয়।

১৮ মাসে ১৩ মামলায় আসামি করা হয় তারেক রহমানকে। রিমান্ডের নামে করা হয় সীমাহীন নির্যাতন ও নিপীড়ন। মূলত তারেক রহমানের জনপ্রিয়তায় তারা ভীত ছিল। উদ্দেশ্য ছিল অসামান্য প্রতিভাবান এই নেতাকে নিশ্চিহ্ন করা। বেগম খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী করার প্রলোভন দেখিয়ে ১৩টি শর্তে মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। সেই শর্তগুলো দেশ বিরোধী হওয়ায় মানেননি খালেদা জিয়া। বিদেশ যাওয়ার জন্য তাকে প্রলুদ্ধ করা হয় কিন্তু দেশের মাটি, মানুষকে ছেড়ে তিনি যাননি। বলেছিলেন, বাংলাদেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নাই, বাংলাদেশ আমার একমাত্র ঠিকানা। শতবাঁধা বিপত্তি উপেক্ষা করে তিনি দেশেই থেকেছেন। তাই বাংলাদেশের মানুষ কাকে আপোশহীন নেত্রী মনে করেন? তিনি নিজের ব্যাপারে বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ তার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে আমার রাজনৈতিক জীবন জড়িয়ে আছে। তাদের সুখ, দুঃখ, উত্থান, পতন, সাফল্য-ব্যর্থতা, আশা-আকাঙ্ক্ষার সাথে আমি একান্তভাবে জড়িত। আমার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সঙ্গে মিশে গেছে।

২০০৯ আওয়ামী লীগে সরকার ক্ষমতায় আসার পরে আবারও শুরু হয় খালেদা ও তার দলের উপর অবর্ণনীয় নির্যাতন। হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে গুম, হত্যা, কারারুদ্ধ করা হয়। নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছেন জিয়া ও তার বিএনপিকে। ২০১৮ সালে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে স্বৈরাচার শেখ হাসিন। সাজানো নাদিতে পাতানো রায়ে ৫ বছর শ্ব শ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বন্দী করে নিঃস্ব অবস্থায় রাখা হয় পরিত্যক্ত কারাগারে। নজিরবিহীন জুলুম, নির্যাতন করা হয় তার উপর। ¯কেœবা-পিং? বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর ঠেলে দেওয়া যাবে। অবশেষে ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিনা ভোটের সরকার শেখ হাসিনার পতন হয়। একদিকে ছাত্র-জনতার ভয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা, আরেকদিকে নির্দোষ প্রমাণ হয়ে সসম্মানে মুক্তি পান বেগম খালেদা জিয়া। গণতন্ত্রের পক্ষে তার ত্যাগের স্বীকৃতির স্বরূপ, ২০১১ সালে ২৪শে মে নিউ জার্সি স্টেটসসিনেট তাকে ফাইটার ফর ডেমোক্রেসি পাদকে ভূষিত করেন।


খালেদা জিয়ার সবচেয়ে দুঃখের সময় ২০০৭-৮ সাল। এই সময়টায় খালেদা জিয়ার দল ও পরিবার দুটোর অবস্থা ভীষণ নাজুক ছিল। তার দুই ছেলে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। বড়োছেলে তারেক রহমান ছিলেন গুরুতর আহত। তিনি যান লন্ডনে, ছোট ছেলে আরাফাত রহমান ছিলেন অ্যাজমা রোগে আক্রান্ত। তিনি যান থাইল্যান্ড ও পরে মালেশিয়া। এদিকে বিএনপি দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে। বিপর্যয় ঘনিয়ে আসে আবার যখন ২০০৮ সালে আওয়ামী ক্ষমতায় আসে। পরে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে খালেদা জিয়ার ঢাকা সেনানিবাসের মঈনুল রোডের বাড়িটির বরাদ্দ বাতিল করা হয়। পরে ২০১০ সালে ১৩ নভেম্বর তাকে সেই বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। যেখানে তিনি ৩৮ বছর ধরে বসবাস করছিলেন। মূলত, জিয়াউর রহমান প্রাণ হারানোর পর তৎকালীন সেনা প্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ টোকেন মূল্যে ওই ২.৭২ একর বাড়িটি খালেদা জিয়াকে বরাদ্দ দেন। এরপরও খালেদা জিয়ার বিপর্যয় শেষ হয়নি। ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে খালেদা জিয়া তার গুলশানের অফিসে অবরুদ্ধ হন। এই অবস্থায় আরাফাত রহমান কোকো মালেশিয়ায় প্রাণ হারান। পারিবারিক জীবনে ঝড় ঝরনার সময়টাতে তিনি একে ভোলেননি।

২০১৩ সালের নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। তার গুলশানের বাড়ির সামনে দুই পাশে বালির ট্রাক দিয়ে আটকে রাখা হয়। এসময় খালেদা জিয়া রেগে গিয়ে পুলিশকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন- এরা সবাই গোপালগঞ্জের, গোপালগঞ্জের নাম বদলে যাবে। কিন্তু ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো প্রাণ হারানোর পর থেকে খালেদা জিয়ার মন ও শরীর ভেঙে যায়। তিনি অসুস্থ হয়ে পয়েন্ট। খালেদা জিয়ার অসুস্থতা বিএনপিকে অনেক ভুগিয়েছে। হার্ট, কিডনি, লিভারসহ অনেক রোগে ভুগিয়েছেন। তার হার্টে তিনটি ব্লক ছিল। আগে একবার রিং পরানো হয়েছিল, তাই ২০২৪ তার শরীরে প্রেস মেকার বসানো হয়।

উন্নতা চিকিৎসার জন্য গত ৮ জানুয়ারি লন্ডনে যান বেগম খালেদা জিয়া। তাকে নেওয়ার জন্য বিদেশ থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পাঠান দুবাই থেকে আমির তাইম বিন হাম্মাদ। বিমান বন্দরে তাকে ভিআইপি প্রটোকল দেন। বিমানবন্দর থেকে স্বাগত জানিয়ে বরন করেন তার ছেলে তারেক রহমান এবং তার স্ত্রী। দীর্ঘ সাত বছর পর এটাছিল এক আবেগঘন সাক্ষাৎ। স্বৈরাচার পতনের পর মায়ের সাথে এই সাক্ষাৎ বাংলাদেশের মানুষের মনে বইয়ে দিয়েছে আনন্দের সুবাতাস। লন্ডনে উন্নত চিকিৎসার পরে তিনি আবার দেশে ফিরে আসেন। দেশে কিছুদিন থাকার পরে আবারও ২৬ নভেম্বর রাতে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানানো হয়, তার ফুসফুসে ইনফেকশন হয়েছে। পাশাপাশি দেখা দিয়েছে নিউমোনিয়া-এর সঙ্গে কিডনি, লিভার, আর্থাইটিকস ও ডায়াবেটিসের পুরোনো সমস্যা। ফলে পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে, একটি রোগের চিকিৎসা করাতে গেলে আর একটির উপর প্রভাব পড়ে। যার ফলে এমন পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটময় হয়ে পড়ে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ৮০ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

এক আপোশহীন নেত্রীর চির বিদায় বাংলাদেশের মানুষকে পুরো স্তব্ধ করে দিয়েছে। তার মৃত্যুতে ড. ইউনুস তিন দিনের শোক ঘোষণা করেন এবং ১ দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেন। জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ বিকেল ৪.৫০ মিনিটে তাকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। তার জানাজায় প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ মানুষ উপস্থিত ছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া শুধু একটি নাম নন। তিনি এক আবেগ, এক ইতিহাস, এক অনমনীয় প্রতিজ্ঞা। গণতন্ত্রের জন্য তার ত্যাগ, সংগ্রাম আর অবিচলতা তাকে করে তুলেছে “গণতন্ত্রের মা”। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

আপোশহীন নেত্রী, গণতন্ত্রের মা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের সংক্ষিপ্ত ধারাবিবরণী:
১৫ আগস্ট ১৯৭৫ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সপরিবারে নিহত হলে বেগম খালেদা জিয়া প্রত্যক্ষভাবে জাতীয় রাজনীতির নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হন। এখান থেকেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নীরব প্রস্তুতি শুরু।
১৯৭৮ জিয়াউর রহমান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হন।
১৯৮২ (২৪ মার্চ) লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতন্ত্র বিলুপ্ত হলে খালেদা জিয়া স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় হন।
১৯৮৩ (মে) বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
১৯৮৪ (১০ মে) বিএনপির চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন। এই দিন থেকেই তিনি দলটির প্রধান নেতৃত্বে আসেন।
১৯৮৪,১৯৯০ এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও গৃহবন্দি হন। কারাবরণ করেও আন্দোলন থেকে সরে যাননি।
৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ গণ-অভ্যুত্থানের মুখে স্বৈরাচার এরশাদের পতন ঘটে। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জিত হয়।
২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়।
২০ মার্চ ১৯৯১ বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ বিতর্কিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
৩০ মার্চ ১৯৯৬ তীব্র আন্দোলনের মুখে তাঁর সরকার পদত্যাগ করে ক্ষমতার চেয়ে গণতন্ত্রকে প্রাধান্য দেওয়ার নজির স্থাপন করেন।
১২ জুন ১৯৯৬ সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।
১ অক্টোবর ২০০১ অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চারদলীয় জোটের নিরঙ্কুশ বিজয়।
১০ অক্টোবর ২০০১ দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
২০০১–২০০৬ দেশ পরিচালনা করেন পূর্ণ মেয়াদে। অবকাঠামো, শিক্ষা ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
২৮ অক্টোবর ২০০৬ মেয়াদ শেষ করে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।
১১ জানুয়ারি ২০০৭ জরুরি অবস্থা জারি হলে রাজনৈতিকভাবে নিপীড়নের শিকার হন।
৩ সেপ্টেম্বর ২০০৭ গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দি হন।
১১ সেপ্টেম্বর ২০০৮ কারামুক্ত হন।
২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিরোধীদলীয় নেত্রী হন।
৫ জানুয়ারি ২০১৪ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেন এবং নির্বাচনি গণতন্ত্র রক্ষার অবস্থান নেন।
৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাবন্দি হন।
২৫ মার্চ ২০২০ বিশেষ নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষ মুক্তি পান।
৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫ তিনি মৃত্যু বরণ করেন।
 
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন মানেই সংগ্রাম, কারাবরণ, আন্দোলন আর আপোশহীন অবস্থান। ক্ষমতা তাঁর কাছে কখনো শেষ লক্ষ্য ছিল না- গণতন্ত্রই ছিল তাঁর রাজনীতির মূল দর্শন।

 
 
তারেক রহমান : রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নেতৃত্ব
তারেক রহমানের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মূল ভিত্তি হলো জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী আদর্শ, বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় বিকেন্দ্রীকরণ, শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা এবং দলীয় কাঠামোকে তৃণমূল থেকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন। এ কারণেই তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচিতে “গ্রাসরুট পলিটিক্স” বা তৃণমূলভিত্তিক সংগঠন পুনর্গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। তিনি মনে করেন, গণতন্ত্র টিকে থাকে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল ও কার্যকর বিরোধী রাজনীতির মাধ্যমে।

সাধারণত তারেক জিয়া নামে ডাকেন। তার ডাক নাম পিনু। তারেক জিয়ার জন্ম ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর। তারেক রহমান ঢাকার রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ হতে মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি সেন্ট যোসেফ কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে আইন বিভাগ ও পরে লোক প্রশাসন বিভাগে ভর্তি হন। লন্ডনে যাওয়ার পরে তিনি আইন শাস্ত্র বিষয়ে পড়েছেন।

পিতা জিয়াউর রহমান-এর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের হয়ে বগুড়া কমিটির সদস্য হিসেবে যোগদান করে তারেক রহমান রাজনীতিতে দলের সূচনা করেন। যদিও তিনি কোনো সাংগঠনিক পদে ছিলেন না, তবুও দলীয় কৌশল নির্ধারণ, সাংগঠনিক নিয়োগ এবং নির্বাচনি প্রস্তুতিতে তাঁর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০০৯ সালে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং পরবর্তীতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হওয়ার পর তিনি কার্যত দলের প্রধান নীতিনির্ধারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। প্রবাসে অবস্থান করেও ভার্চুয়াল সভা, নির্দেশনা ও রাজনৈতিক বার্তার মাধ্যমে তিনি দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টা করছেন-যা আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর রাজনীতির একটি নতুন দিক নির্দেশ করে।

১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তারেক রহমান তার মা খালেদা জিয়ার সহচর হিসেবে সারা নির্বাচনি প্রচারণায় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৯৬ সালে জাতীয় নির্বাচনের সময়, দলের তৃণমূল এবং সিনিয়র নেতৃবৃন্দ তারেক রহমানকে বগুড়া থেকে একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য অনুরোধ করেছিল। কিন্তু তিনি তৃণমূলে আরো এগিয়ে নেওয়ার জন্য তার মায়ের জন্য নির্বাচন প্রচারণার লক্ষ্যে প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। ২০০১ সালে নির্বাচনেও তারেক রহমান মা খালেদা জিয়ার নির্বাচন প্রচারণার পাশাপাশি পৃথক পরিকল্পনা চালান দেশব্যাপী। মূলত ২০০১ সালে দেশব্যাপী নির্বাচন প্রচারণার মাধ্যমে তারেক রহমান সক্রিয় আগমন ঘটে। ২০০২ সালে তারেক রহমান দলের স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হিসাবে যোগদান করেন। দলের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে নিয়োগ প্রাপ্ত হওয়ার পরে তারেক রহমান দেশব্যাপী মাঠ পর্যায়ে নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের সাথে ব্যাপকভাবে জনসংযোগ শুরু করেন।

ফকরুদ্দীন আহমেদ ও সেনা প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মইনউদ্দীন আহমেদ, ২০০৭ সালে ১২ জানুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ মামলা দায়ের করা হয়। ২০০৭ সালের ৭ই মার্চ একটি দুর্নীতির মামলায় আসামি হিসেবে জনাব তারেক রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট অবস্থিত মইনুল রোডের বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার কারা হয়। তার বিরুদ্ধে আরো ১৩টি দুর্নীতির মামলায় গ্রেফতার করা হয় ও তাকে বিচারের সম্মুখীন করা হয়। গ্রেফতারের কিছুদিন পর তারেক রহমানকে আদালতে নেওয়া হলে শারীরিক অবস্থার অবনতির জন্য আইনজীবীর আদালতে অভিযোগ করেন, জিজ্ঞাসাবাদ করার সময় তার উপর শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশে চিকিৎসকদের এক দল পরীক্ষা নিরীক্ষার পর জানা যায় যে তার উপর শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ যুক্তিযুক্ত। এই পর্যায়ে আদালত রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ সিথিল করে কমিয়ে একদিন করে এবং জিজ্ঞাসাবাদে সাবধানতা অবলম্বনের আদেশ দেন। এরপর তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পরিবর্তে ঢাকা শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তর করে।

সেখানে কিছুদিন থাকার পরে খবর আসে যে তারেক রহমান হসপিটালের ওয়াশরুমে পড়ে অসুস্থ হয়ে গেছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করা শুরু করে দেয় ছাত্ররা, তারমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ আন্দোলন বিক্ষোভে ছড়িয়ে পাড়ে। প্রায় ১৮ মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালে সেপ্টেম্বর মাসে সবগুলো মামলা থেকে জামিন লাভ করে। বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে থাকাকালীন মুক্তি লাভ করেন। ২০০৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে খালেদা জিয়া মুক্তি লাভ করার পরে তারেক রহমানকে দেখতে যান শেখ মুজিব মেডিক্যাল হসপিটালে। সেদিন রাতে তারেক রহমানকে উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে রওনা হন। এই পর্যায়ে তাকে রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার জন্য সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল অঙ্গীকারনামা।

এরপর লন্ডন থেকে আবার পূর্ণাঙ্গ রাজনীতিতে শুরু করে তারেক রহমান। বিশেষভাবে জুলাই আন্দোলনের পর এটা বেশি করে। গত এক বছর ২০টি জেলা কমিটি অঙ্গ ও সাহযোগী সংগঠনগুলোর সাথে দফায় দফায় কাজ করেন। অবশেষে সব মামলা থেকে মুক্ত হয়ে ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে দিনটি তারেক রহমান ও বিএনপির জন্য এটা একটি ঐতিহাসিক দিন।
সব শঙ্খা কাটিয়ে সেদিন তারেক রহমান দেশের মাটিতে পা রাখেন। দেশে ফিরে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর, ভিআইপি লাউজ থেকে তারেক রহমান ফোনে কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহম্মাদ ইউনুসের সাথে। সে সময় তিনি ড. মুহম্মাদ ইউনুসকে ধন্যবাদ জানান। বিমান বন্দর থেকে বের হয়েই তিনি খালি পায়ে শিশির ভেজা ঘাসে দাঁড়িয়ে ১৭ বছর পর দেশের মাটির স্পর্শ নেন।

অন্যদিকে তার প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে পুরো রাজধানী জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সেই জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে তিনি যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, সে বক্তৃতার শুরুতে ছিল প্রিয় বাংলাদেশ, এর পর লাখ লাখ মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে তারেক রহমান বলেছিলেন, আই হ্যাভ এ প্ল্যান ফর দ্য পিপল, দ্য কান্ট্রি। দেশের মানুষের জন্য সেই প্লান্ট বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা দরকার।

বক্তব্য শেষ করে তারেক রহমান এভার কেয়ার হাসপাতালে তার চিকিৎসাধীন মা খালেদা জিয়াকে দেখতে যান। হাসপাতালে মাকে দেখে সেখান থেকে যান গুলশান অ্যাভিনিউর ১৯৬ নম্বর বাসায়, যার পাশেই ফিরোজা যে বাড়িতে থকতেন খালেদা জিয়া। দেশে ফেরার একদিন পর ২৬ ডিসেম্বর শুক্রবার জম্মার নামাজ শেষে গুলশানের বাসভবন থেকে প্রথমে রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে বাবা জিয়াউর রহমানের কবর জিয়রত করেন। দীর্ঘদিন পর বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক আবেগঘন বহুত্ব সৃষ্টি করে। পরের দিন তারেক রহমানের ছোটোভাই আরাফাত রহমান কোকোর কবর জিয়ারত করেছেন রাজধানীর বনানীর কবরস্থানে। ১টা ৫৫ মিনিটের দিকে পৌঁছানো তিনি। কোকোর কবর জিয়ারত করার পর তার শ্বশুর মাহবুব আলি খানের কবর জিয়ারত করেন। সেদিন সকালে ইনকিলাব মঞ্চের শহিদ ওসমান হাদীর কবর জিয়ারতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও গিয়েছিলেন তিনি। পরদিন সকালে মা খালেদা জিয়াকে দ্বিতীয়বার দেখতে যান।

তারপর দীর্ঘ দেড়যুগ পরে ২৯ ডিসেম্বর বিএনপি কার্যালয়ে যান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেদিনও উজ্জীবিত জনগণের ও নোতাদের নতুন করে দেশ গড়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, যার যতটুকু অবস্থান আছে, আসুন নতুক করে দেশটাকে গড়ে তোলার চেষ্টা করি। সবার কপালে সুখ বেশিদিন থাকে না। তারেক রহমানের বেলাতেও তাই। ৩০ ডিসেম্বর তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া পৃথিবী ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমায়। মাকে হারিয়ে বিমর্ষ হয়ে পড়েন তারেক রহমান। তবে মায়ের পাশে বসে তাকে কোরান তেলাওয়াত করতে দেখা গেছে।


৩১ ডিসেম্বর তারেক রহমান রাষ্ট্র কাঠামো ৩১ দফা ঘোষণা করেন। যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের মানুষের জন্য।
সেই ঐতিহাসিক ৩১ দফা:
১.জনগনের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃ : প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন।
২. সম্প্রতিমুলক রাষ্ট্রসত্তা ও জাতীয় সমন্বয় কমিশন গঠন।
৩. অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নির্বাচনকালীন দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্র্তন।
৪. আইন সভা, মন্ত্রী সভা, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিচার বিভাগের মাঝে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা।
৫. প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের সময়সীমা অন্ধকার পরপর দুই মেয়াদ নির্ধারণ।
৬. বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে আইন সভার উচ্চ কক্ষের প্রবর্তন।
৭. সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন।
৮. নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি সংশোধন।
৯. স্বচ্ছতা নিশ্চিত করলে সব রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করণ।
১০. বর্তমান বিচার ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য জুডিশিয়াল কমিশন গঠন। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনঃপ্রবর্তন ও সংবিধানের আলোকে বিচারপতি নিয়োগ আইন প্রণয়ন।
১১. জনমুখী ও জনকল্যাণমূলক প্রশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠন।
১২. মিডিয়া কমিশন গঠন করে তথ্য ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করণ।
১৩. দুর্নীতি প্রতিরোধে দৃশ্যমান কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ ও ন্যায়পাল নিয়োগ।
১৪. সর্বস্তরে আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা
১৫. আত্মনির্ভরশীল জাতীয় অর্থনীতিত গড়ে তোলার লক্ষ্যে অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠন।
১৬. ধর্মীয় স্বাধীনতার সর্বোচ্চ ও কার্যকর নিশ্চয়তা প্রদান।
১৭. মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও দ্রব্যমূল্য হ্রাস বৃদ্ধির আলোকে শ্রমজীবী মানুষের মজুরি নির্ধারণ।
১৮. প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ ও নবায়নযোগ্য মিশ্র জ্বালানি ব্যবহারে অধিক গুরুত্ব; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ খাত আধুনিকায়ন।
১৯. জাতীয় স্বার্থের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করে বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নয়ন।
২০. প্রতিরক্ষা বাহিনীর অধিকতর আধুনিকায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা।
২১. প্রশাসন সেবা বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গুলির স্বশাষিত ও ক্ষমাতাবান করা।
২২. শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও স্বীকৃতি প্রদান।
২৩. কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দিয়ে আধুনিক ও যুগোপযোগী যুব উন্নয়নের নীতিমালা প্রণয়ন ও বেকার ভাতা প্রবর্তন।
২৪. নারীর মর্যাদা রক্ষা ও ক্ষমতায়নের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ।
২৫. চাহিদা ও জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম শিক্ষিত জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা।
২৬. সবার জন্য স্বাস্থ্য ও সর্বজনীন চিকিৎসা ব্যবস্থা কার্যকর করা। প্রাথমিক ও প্রতিরোধী মুলক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রখ্যাত সংখ্যায় শিক্ষিত নারী-পুরুষ পল্লি স্বাস্থ্যকর্মীর ব্যবস্থা করা এবং সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা শিক্ষা ল্যাব নিশ্চিত করণ।
২৭. কৃষকদের উৎপাদন ও বিপণন সুরক্ষা দিয়ে কৃষি পণ্যের মূল্য নিশ্চিত করা।
২৮. সড়ক, রেল ও নৌ পথের আধুনিকায়ন ও বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।
২৯. জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট মোকাবিলা, মহাকাশ গবেষণা এবং আণবিক শক্তির উন্নয়ন ও সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করণ।
৩০. যুগোপযোগী পরিকল্পিত পরিবেশ প্রণয়ন-এর নগরায়ণ নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।
৩১. আবাসন ও নগরায়ণ।

একটি সমন্বিত জাতীয় মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে গ্রাম ও শহরের সমন্বিত উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। এতে কৃষিজমি রক্ষা, শহরের জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ কমানো এবং পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব দরিদ্র ওনি¤œ আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ততা বাসস্থান নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও এই শেষ দফায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
 

তারেক রহমানের জীবন ও রাজনৈতিক জীবনের ধারাবিবরণী

জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
২০ নভেম্বর ১৯৬৫ : বগুড়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন তারেক রহমান। পিতা ছিলেন শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, এবং মা বেগম খালেদা জিয়া, যারা বাংলাদেশের রাজনীতির উজ্জ্বল নাম।

শিক্ষা জীবন
মাধ্যমিক শিক্ষা : ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ থেকে মাধ্যমিক পাস করেন।
উচ্চ মাধ্যমিক : নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা : ১৯৮৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন, পরে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে স্থানান্তরিত হন এবং ১৯৮৮ সালে ডিগ্রি অর্জন করেন।
(কিছু প্রতিবেদনে বলা হয় তিনি পরে পড়াশোনা মাঝপথে বন্ধ করেন এবং ব্যাবসা ও রাজনৈতিক কাজে যুক্ত হন।)
 
রাজনীতিতে প্রবেশ ও উত্থান :
১৯৮৮ সালে পেশাদার রাজনীতিতে প্রবেশ করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) গাবতলী উপজেলা, বগুড়া শাখার সাধারণ সদস্য হিসেবে।
 
জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা :
১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজে মনোনয়ন নিয়ে না থাকলেও প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা নেন- দেশব্যাপী কর্মসূচি ও দলের গণসংযোগে অংশ নেন।
 
দলের নেতৃত্ব ও দায়িত্ব :
২০০২ সালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে যোগাযোগ যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে মনোনয়ন করা হয়।
 
৮ ডিসেম্বর, ২০০৯ : বিএনপি’র ৫তম জাতীয় কাউন্সিলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন; এটি তাঁর দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে প্রথম বড়ো পদ।
১৯ মার্চ, ২০১৬ : বিএনপি’র ৬ষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে দ্বিতীয়বার সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং দলের ওপর প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেন।
আইনি ঝামেলা, কারাবন্দি জীবন ও নির্বাসন :
৭ মার্চ, ২০০৭ : তৎকালীন সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে এবং বিভিন্ন মামলার মুখোমুখি হতে হয়। ১৩টির বেশি জটিল মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন বলে সংবাদে উল্লেখ করা হয়।
৩ সেপ্টেম্বর, ২০০৮ : দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকার পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জামিন পান এবং পরবর্তীতে পরিবারসহ লন্ডনে প্রবাসী অবস্থান নেন।
 
প্রবাসে থেকেও দলীয় কার্যক্রমে নেতৃত্ব প্রদান করেন। ভার্চুয়াল সভা, কৌশলগত নির্দেশনা এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়েও বক্তব্য রাখছেন। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৫।

১৭ বছর পর স্ত্রী ডা. জেবেদা রহমান এবং কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে নিয়ে দেশে ফিরলেন তারেক রহমান। আজ তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন এবং দলের রাজনীতি ও আদর্শিক নেতৃত্বে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করছেন।

লেখক: মোহাম্মদ খোকন
              সদস্য, রমনা থানা বিএনপি

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. মানবতাবিরোধী অপরাধে নাছিম-আরাফাত-পরশসহ ৭ শীর্ষ নেতার মৃত্যুদণ্ড সদ্য. নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো আজ সিলেট সফরে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি সদ্য. মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ওবায়দুল কাদেরের মৃত্যুদণ্ড সদ্য. কেন্দ্রীয় নেতাদের দিল্লিতে তলব করেছেন শেখ হাসিনা সদ্য. লালমাটিয়া থেকে আ. লীগের সাবেক এমপি আজিজুল হক আরজু আটক সদ্য. বিদেশি ভাষা শিখতে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ঋণ দেবে সরকার সদ্য. চারটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্যসূচি নিয়ে আজ অনুষ্ঠিত হবে সচিব সভা সদ্য. ওবায়দুল কাদের-সাদ্দামসহ ৭ পলাতক আ. লীগ নেতার ভাগ্য নির্ধারণের দিন আজ সদ্য. দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির আভাস, কমতে পারে তাপমাত্রা সদ্য. নতুন পে স্কেলে গ্রেডভেদে বাড়ি ভাড়াসহ যেসব ভাতা কমছে-বাড়ছে সদ্য. মানবতাবিরোধী অপরাধে নাছিম-আরাফাত-পরশসহ ৭ শীর্ষ নেতার মৃত্যুদণ্ড সদ্য. নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো আজ সিলেট সফরে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি সদ্য. মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ওবায়দুল কাদেরের মৃত্যুদণ্ড সদ্য. কেন্দ্রীয় নেতাদের দিল্লিতে তলব করেছেন শেখ হাসিনা সদ্য. লালমাটিয়া থেকে আ. লীগের সাবেক এমপি আজিজুল হক আরজু আটক সদ্য. বিদেশি ভাষা শিখতে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ঋণ দেবে সরকার সদ্য. চারটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্যসূচি নিয়ে আজ অনুষ্ঠিত হবে সচিব সভা সদ্য. ওবায়দুল কাদের-সাদ্দামসহ ৭ পলাতক আ. লীগ নেতার ভাগ্য নির্ধারণের দিন আজ সদ্য. দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির আভাস, কমতে পারে তাপমাত্রা সদ্য. নতুন পে স্কেলে গ্রেডভেদে বাড়ি ভাড়াসহ যেসব ভাতা কমছে-বাড়ছে